মিয়ানমারের সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে সই হওয়া এক চুক্তির অধীনে রোহিঙ্গাসহ প্রায় পাঁচ হাজার আশ্রয়প্রার্থীকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে মালয়েশিয়া।
আজ বুধবার বিকেলে প্রথম দফায় এক হাজার ৪৭৬ জন রোহিঙ্গাকে নিয়ে মিয়ানমার নৌবাহিনীর তিনটি জাহাজ মালয়েশিয়া ছাড়ার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
এতে বলা হয়, মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ পদক্ষেপের নিন্দা জানালেও মালয়েশিয়া সরকারের দাবি, এই প্রত্যাবর্তন স্বেচ্ছায় হচ্ছে।
তবে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো আশ্রয়প্রার্থীদের তথ্য ও নিরাপত্তা যাচাই করার কোনো সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ায় থাকা বিশাল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি সাধারণ মানুষের বিদ্বেষ ও ক্ষোভ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আর এ কারণেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা ছাড়া তার কাছে আর কোনো বিকল্প উপায় ছিল না বলেও দাবি করেছেন তিনি।
ইউএনএইচসিআরের বরাতে বিবিসি জানায়, বর্তমানে মালয়েশিয়ায় দুই লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার বাস। যাদের বেশিরভাগই দিনমজুর হিসেবে কোনোরকমে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
তবে মিয়ানমারে নাগরিক হিসেবে রোহিঙ্গাদের কোনো স্বীকৃতি না থাকা স্বত্ত্বেও তাদের কীভাবে ফেরত পাঠানো হচ্ছে তা এখনো স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছে বিবিসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের ভেতরে রোহিঙ্গাদের ভ্রমণের কোনো অনুমতি নেই। তারা কেবল রাখাইন রাজ্যে বসবাস করতে পারেন। কিন্তু বর্তমানে রাখাইনের প্রায় পুরোটাই সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এলাকাটিতে প্রায়ই বিমান হামলা চালাচ্ছে জান্তা সরকার।
এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর মতো একমাত্র সম্ভাব্য জায়গা হতে পারে রাখাইনের রাজধানী সিত্তে। শহরটি বর্তমানে অবরুদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন। সেখানে বর্তমানে একটি শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছে রোহিঙ্গারা।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে, ফেরত পাঠানো রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে চরম সহিংসতা, নির্যাতন এবং সেনাবাহিনীতে জোরপূর্বক নিয়োগের ঝুঁকিতে পড়বেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মালয়েশিয়া বা মিয়ানমার—কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত ব্যাখ্যা করেনি কীভাবে তারা এইসব বাধা কাটাবে এবং এই পরিকল্পিত প্রত্যাবাসন কীভাবে মানবিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক কারণে চাপের মুখে বাধ্য হয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।
অতীতে তিনি নিজেকে মানবাধিকার ও স্বাধীনতার প্রধান রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছেন এবং রোহিঙ্গাদের সহায়তায় আরও বেশি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি তুলেছিলেন। এমনকি মিয়ানমারে মিন অং হ্লাইংয়ের সামরিক শাসনকে স্বীকৃতি দিতেও রাজি হননি।
হঠাৎ তার এই পরিবর্তনের পেছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কোভিড অতিমারী পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়ার নিম্ন-আয়ের মানুষদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে। যা স্থানীয়দের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রতি বিদ্বেষ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ২০১৮ সালের পর থেকে মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। ওই বছর নির্বাচনে টানা ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা ‘ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন’ হেরে যায়। এরপর থেকেই দেশটিতে একের পর এক ভঙ্গুর জোট সরকার গঠিত হতে দেখা গেছে।
আনোয়ার ইব্রাহিম নিজে বর্তমানে প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন এবং তার জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকেছে।
ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যাম মালয়েশিয়ার এশিয়ান ইনস্টিটিউট ফর পলিসি অ্যান্ড এনগেজমেন্টের পরিচালক ত্রিশা ইয়ো বিবিসিকে বলেন, ‘তিনি এখন রাজনৈতিকভাবে এক কোণঠাসা ও চরম দুর্বল পরিস্থিতিতে রয়েছেন। জোটসঙ্গী ইউএমএনওয়ের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন।’
আগামী ২০২৮ সালের শুরুর দিকে দেশটিতে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়া সফরে আসেন মিয়ানমারের সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং। ওই সময় এ চুক্তি সই করে দুই পক্ষ। তবে চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করেনি মালয়েশিয়া।
