জনপ্রশাসনে শৃঙ্খলার ঘাটতি দূর করতে, দুর্নীতি বন্ধে এবং গতিশীলতা বাড়াতে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে ২৩ দফা নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গতকাল এই নির্দেশনা জারি করা হয়।
নির্দেশনাগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়নের জন্য সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই প্রথম কোনো সমন্বিত প্রশাসনিক নির্দেশনা।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব নির্দেশনার কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সচিবদের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই নির্দেশনাগুলো চূড়ান্ত করা হয়। ওই বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অন্তত ৬১ জন সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব উপস্থিত ছিলেন। বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল সচিব পর্যায়ের প্রথম বৈঠক।
এই নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে দুর্নীতিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করতে অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন, পদোন্নতি বা বদলির জন্য তদবির করলে কঠোর শাস্তি এবং সব সরকারি দপ্তরে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা চালু করা।
নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী পদোন্নতি, বদলি বা চাকরির সুবিধার জন্য তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রভাব খাটানোর বা তদবির করার চেষ্টা করলে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর আওতায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের চেষ্টার বিস্তারিত তথ্য ওই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নথিতে যুক্ত করা হবে।
দুর্নীতির অভিযোগ থাকা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চিহ্নিত করতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া একই কর্মকর্তা যাতে বিভিন্ন দপ্তর বা সংস্থার মাধ্যমে বারবার সরকারি সফরে বিদেশে না যান, তা নিশ্চিত করতে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট লেখক ফিরোজ মিয়া দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘নতুন সরকার গঠনের এক বা দুই মাসের মধ্যে এ ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হলে ভালো হতো। তাহলে ছয় বা সাত মাস পর এর অগ্রগতি পর্যালোচনা করা যেত।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে কাজের গতি ধীর। দেরিতে হলেও এই নির্দেশনাগুলোকে যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখা না হয় এবং এগুলোর যথাযথ তদারকি হওয়া উচিত। তা না হলে অতীতের মতো এসব কথা শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।’
সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে (সিসিজিপি) কোনো প্রস্তাব পাঠানোর আগে বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সচিবদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্রয়ের প্রস্তাবের সারসংক্ষেপ পিপিআর, ২০২৫-এর তফসিল-৭ অনুযায়ী হতে হবে এবং সভার অন্তত চার কার্যদিবস আগে তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিতে হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, সরকারি দপ্তর বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর মধ্যে জমি বা আইনি বিরোধ থাকলে, মামলা-মোকদ্দমায় না জড়িয়ে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে তা নিষ্পত্তি করতে হবে।
প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে এবং সময়মতো উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সব সরকারি দপ্তরে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা চালু করা হবে। সব দপ্তরের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য আইসিটি বিভাগ একটি কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ড তৈরি করবে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সব সরকারি স্থাপনায় সোলার প্যানেল বসাতে হবে এবং বিদ্যুতের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে প্রতি দুই মাস পরপর বিদ্যুৎ বিভাগে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে অপ্রয়োজনীয় পদ বিলুপ্ত করতে এবং বিদ্যমান শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মন্ত্রণালয়গুলোকে। সরকারি কর্মচারীদের পেশাগত পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য ক্যাডার পদগুলোর সঠিক হিসাব রাখতে এবং প্রতি তিন মাস অন্তর স্ব স্ব দপ্তরের অর্গানোগ্রাম হালনাগাদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া নির্দেশনায় হয়রানিমুক্ত সরকারি সেবা প্রদান, খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা পালন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকি জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সব সরকারি দপ্তরের প্রাঙ্গণ পরিষ্কার রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও বিভাগীয় কমিশনারদের মাধ্যমে প্রতি ১৫ দিন অন্তর সচিবালয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সচিব গতকাল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘শীর্ষ পর্যায় থেকে দেওয়া নির্দেশনাগুলো কাগজে-কলমে সব সময়ই ভালো শোনায়। আসল বিষয় হলো সেগুলো বাস্তবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, আর না হলে কেন হচ্ছে না—সেই তদারকিটা খুব জরুরি। নতুন সরকারের অধীনে পরিস্থিতি কীভাবে এগোয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।’
