চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের নানা টানাপোড়েনের মধ্যেই ওয়াশিংটনে বৈঠক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইরান ও তাইওয়ানসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবারের বৈঠকে কিছু বিষয়ে সমঝোতার ইঙ্গিত মিললেও স্পর্শকাতর কয়েকটি ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থানের পার্থক্যও স্পষ্ট হয়েছে। বৈঠকের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো তুলে ধরেছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈঠকে শির সঙ্গে নিজের ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের’ প্রশংসা করেন ট্রাম্প। শি যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছালে রানওয়েতে গিয়ে তাকে স্বাগত জানান ট্রাম্প। এ ছাড়া তাকে প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টার ঘুরিয়ে দেখান এবং উপহার হিসেবে একটি ন্যাড়া মাথার ঈগলের মূর্তি দেন।
তবে বিশ্লেষকদের মত, কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বড় কোনো অগ্রগতি না হওয়ার বিষয়টি ধামাচাপা দিতেই ট্রাম্পের এতসব আয়োজন।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের রায়ান হাসের মতে, ‘জাঁকজমক দেখানোটাই ছিল মূল লক্ষ্য।’
তিনি বলেন, ‘সেনাদের কুচকাওয়াজ ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বাদ দিলে দুই নেতা সরাসরি দুই ঘণ্টারও কম সময় বৈঠক করেছেন।’
শির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বৈঠকে ‘অনেক নতুন ঐকমত্য’ তৈরি হয়েছে।
তবে ঘোষিত সুনির্দিষ্ট চুক্তি বলতে ছিল বিনিময় কর্মসূচির আওতায় এক লাখ তরুণ আমেরিকানকে চীনে আমন্ত্রণ জানানোর প্রতিশ্রুতি এবং আটলান্টার একটি চিড়িয়াখানায় দুটি পান্ডা দেওয়ার সিদ্ধান্ত।
হাস জানান, এই বৈঠকের মাধ্যমে এটাই প্রমাণ হয়েছে যে দুই নেতা চাইলে প্রতিযোগিতার মনোভাবকে সহনীয় মাত্রায় রেখে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে পারেন।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আবারও দুই পক্ষকে ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ বা থুসিডাইডিস ফাঁদ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন পুরোনো কোনো শক্তিশালী দেশ দেখে, নতুন কোনো দেশ উন্নতির মাধ্যমে সক্ষমতায় বা শক্তিতে তাদের সমান হয়ে যাচ্ছে, তখন পুরোনো দেশটি ভয় পেয়ে যায়। এই ভয় থেকে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত বা যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরির ঝুঁকি দেখা দেয়।
দুই নেতার বেঠকে তাইওয়ান বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।
পৃথিবীর সব মানুষের কাছে এআই বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নামে পরিচিত হলেও ট্রাম্প একে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন। এআইখাতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে নিজেদের অবস্থানে বড় ধরনের পার্থক্যের ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প ও শি।
প্রযুক্তি খাতের নেতারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরির আহ্বান জানালেও ট্রাম্প তা বরাবরই নাকচ করে এসেছেন।
অন্যদিকে শি বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ‘সবসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত’।
সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির ডিলান লোর মতে, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি নিয়ে মোটামুটি সাধারণ ঐকমত্য রয়েছে। তবে এটি কীভাবে পরিচালনা করা হবে, সে বিষয়ে দুই পক্ষের মতপার্থক্য আছে।’
লো বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ‘অবিশ্বাস ও ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার’ কারণে আপাতত এই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা কম।
দুই নেতার বৈঠকের উল্লেখযোগ্য একটি সিদ্ধান্ত হলো, দুই দেশের নাজুক বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ানো। আগামী নভেম্বরে এই বিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
এই সমঝোতার ফলে গত বছর বেইজিং-ওয়াশিংটনের পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের তীব্র বাণিজ্যযুদ্ধ সাময়িকভাবে থেমে যায়।
এর আওতায় চীনা পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক কমানো হয় এবং উৎপাদন খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজের ওপর বেইজিংয়ের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া হয়।
লো মত দেন, ‘সম্ভবত চীন এই বিরতির মেয়াদ আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য বাড়ানোর আশা করেছিল। তবে তারা বাস্তবতাও বোঝে।’
তিনি বলেন, ‘এই বিরতি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে কিছুটা স্বস্তি এনে দেবে।’
সিডনি ইউনিভার্সিটির যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক শিক্ষাকেন্দ্রের গবেষণা পরিচালক জ্যারেড মন্ডশাইনের মতে, ‘চীনের তুলনায় কিছু খাতে দুর্বল অবস্থায় আছে যুক্তরাষ্ট্র। যতদিন পর্যন্ত এই ঘাটতি মেটানো সম্ভব হচ্ছে না, ততদিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছেন ট্রাম্প।’
নিজেকে ডিলমেকার আখ্যা দেন ট্রাম্প। তিনি চীনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও বেশি করে পণ্য কিনে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্কে ভারসাম্য আনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি চাইছেন চীনের সঙ্গে চুক্তি বা ‘ডিল’ চূড়ান্ত করতে।
তবে শির এই সফরে চীনের পক্ষ থেকে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ বা যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কেনার মতো কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
ইরানের সঙ্গে সংঘাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বেরিয়ে আসতে এবং জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে সহায়তার জন্য ট্রাম্প বারবার চীনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বেইজিং এসব আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরানকে সহায়তা করার অভিযোগও রয়েছে চীনের বিরুদ্ধে।
বৈঠকের বিষয়ে চীনের প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার শি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধ বন্ধ করে যত দ্রুত সম্ভব তেহরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর আহ্বান জানান।
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের যুক্তরাষ্ট্র-এশিয়া সম্পর্কের অধ্যাপক রানা মিত্র বলেন, ‘চীন বড় কোনো মধ্যস্থতাকারী শক্তি হিসেবে প্রকাশ্যে এসে সমাধান নিয়ে আলোচনা করবে—এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে আমি মনে করি।’
‘আমার মনে হয় না, এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রকে সংকট থেকে বের করে আনার তুরুপের তাস হতে যাচ্ছে চীন’, যোগ করেন তিনি।
মে মাসে ট্রাম্পকে দেওয়া সতর্কবার্তাটি আবারও পুনরাবৃত্তি করেন শি। তিনি তাইওয়ান প্রসঙ্গে ট্রাম্পকে ‘বিচক্ষণতা’ দেখানোর আহ্বান জানান।
তবে ওই বৈঠকের তুলনায় এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বান জানান।
চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং দ্বীপটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তাইওয়ান তার প্রতিরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার বলেন, তাইওয়ানের জন্য ১৪ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন অস্ত্র প্যাকেজ স্থগিত রাখা হয়েছে এবং এটি ‘পর্যালোচনাধীন’।
মে মাসে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, চীনের সঙ্গে দর-কষাকষিতে এসব অস্ত্র বিক্রিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। এতে তাইওয়ানের নিরাপত্তা নিয়ে সমঝোতা হয়ে যেতে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়।
রানা মিত্র আরও বলেন, ‘আগের প্রশাসনগুলোর তুলনায় ট্রাম্প অস্ত্র বিক্রির মাত্রা নিয়ে আলোচনা করতে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘তবে আমি এমন কোনো লক্ষণ দেখছি না যে তাইওয়ানকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।’
