Friday, September 25, 2026
Homeবাংলাদেশবাড়তি খরচ-মন্দা বাজারের চাপে পোলট্রি খামারিরা

বাড়তি খরচ-মন্দা বাজারের চাপে পোলট্রি খামারিরা

মুরগির খামার আর পরিচালনা করবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মাজেদুল হক।

নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার নোলুয়া গ্রামের এই খামারি পরিকল্পনা করছেন, এ দফায় ব্রয়লার মুরগিগুলো বিক্রির পর খামার বন্ধ করে দেবেন।

তিনি এখন আর হিসাব মিলাতে পারছেন না। একদিকে খাদ্য, ওষুধ ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিচালন ব্যয় বেড়েছে; অন্যদিকে কমেছে মুরগির দাম। বর্তমানে তার খামারে ৩ হাজার মুরগি রয়েছে।

‘এক মাস আগে যে বস্তা খাবারের দাম ছিল ৩ হাজার ৪৭৫ টাকা, এখন বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায়,’ বলেন মাজেদুল। সয়াবিন ফিডের দামও বেড়ে ৯৫০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা হয়েছে। যে ওষুধের দাম ছিল ৩০০ টাকা, এখন তা প্রায় ৩৬০ থেকে ৩৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুতের বাড়তি খরচ। গত মাসে মাজেদুল প্রায় ৬ হাজার টাকার বিল পরিশোধ করেছিলেন, কিন্তু চলতি মাসে তার বিল বেড়ে হয়েছে ১০ থেকে ১১ হাজার টাকা।

অথচ এক মাস আগে প্রতি কেজি মুরগির দাম ছিল ১৪০ টাকা, ৩ দিন আগে প্রতি কেজি ১৩২ টাকা দরে মুরগি বিক্রি করেছেন।

মাজেদুল একা নন। সারা দেশে পোলট্রি খামারিরা একই ধরনের চাপে রয়েছেন।

শিল্প খাতের তথ্য অনুযায়ী, পল্ট্রি ফিডের অন্যতম প্রধান উপাদান ভুট্টার দাম গত ১ মাসে ২৪ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি কেজি ৩১ টাকা ৩০ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৮ টাকা ৮০ পয়সা।

অন্যান্য প্রধান উপাদানের দামও বেড়েছে। ডি-অয়েলড রাইস ব্র্যানের দাম ২৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ২৬ টাকা থেকে হয়েছে ৩৩, আর রাইস ব্র্যান অয়েলের দাম ১৮ শতাংশ বেড়ে ৩৩ থেকে ৩৯ টাকা হয়েছে।

সরিষার খৈলের দাম ৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা ৫০ পয়সা থেকে হয়েছে ৩৯ টাকা ৭০ পয়সা, আর সয়াবিন মিলের দাম ১৪ শতাংশ বেড়ে ৫৮ টাকা থেকে হয়েছে ৬৬ টাকা।

ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (এফআইএবি) এবং বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫০টি নিবন্ধিত ফিড কোম্পানি বছরে প্রায় ৭৫ লাখ টন বাণিজ্যিক খাদ্য উৎপাদন করে।

অনিবন্ধিত কোম্পানিগুলো উৎপাদন করে আরও আনুমানিক ৫ লাখ টন। মোট উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশ পোলট্রি খাবার, আর বাকি অংশ জলজ চাষ ও গবাদিপশুর জন্য ব্যবহৃত হয়।

ফিড ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রধান কাঁচামালের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে। এসব উপাদানের বেশিরভাগের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় স্থানীয় উৎপাদকদের দাম ওঠানামার ওপর নিয়ন্ত্রণ খুবই সীমিত।

তারা বলছেন, শিল্প খাত একা এ সমস্যা মোকাবিলা করতে পারবে না। পোলট্রি খাতকে টিকিয়ে রাখতে তারা লক্ষ্যভিত্তিক সরকারি সহায়তা ও নীতিগত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।

এফআইএবির মহাসচিব মো. আনোয়ারুল হক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ফিডের কাঁচামালের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ায় খামারিদের উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব না হলে কাঁচামালের দাম আরও বাড়তে পারে, যা খামারি ও ভোক্তা—উভয়ের ওপরই বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।

আন্তর্জাতিক বাজার চড়া থাকায় আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কোনো একটি কোম্পানির একার পক্ষে এই ব্যয় বহন করা সম্ভব না, বলেন তিনি।

দেশের বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং পোলট্রি শিল্পকে সুরক্ষা দিতে তিনি সরকারকে কার্যকর নীতিগত সহায়তা দেওয়ার তাগিদ দেন।

ফিড শিল্পের ওপর চাপ কমাতে ডি-অয়েলড রাইস ব্র্যান ও রাইস ব্র্যান রপ্তানিতে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবি জানিয়েছে এফআইএবি।

আমদানি করা কাঁচামালের ওপর ভ্যাট, কর ও শুল্কের হার পর্যালোচনা করে শিল্প খাতকে বিশেষ সহায়তা দেওয়ার জন্যও সংগঠনটি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সে জন্য এফআইএবি বাজারে আরও নিবিড় নজরদারির দাবি জানিয়েছে।

অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে, কাঁচামালের স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো; নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাজারের ওপর চাপ কমাতে সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক বাপন দে বলেন, পোলট্রি শিল্পকে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়া, কাঁচামালের সংকট ও অস্থিতিশীল বাজার পরিস্থিতির মতো সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

তিনি খামারি ও ভোক্তা পর্যায়ের দামের বড় ব্যবধানের বিষয়টিও তুলে ধরেন। ভোক্তারা প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির জন্য প্রায় ১৮০ টাকা দিলেও খামারিরা পান মাত্র ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা। প্রায় ৪০ টাকার এই ব্যবধানের জন্য তিনি খাতটির অসংগঠিত বিপণন ব্যবস্থাকে দায়ী করেন।

নিয়মিত বাজার তদারকি ও পরিদর্শন, প্রকাশ্যে মূল্য তালিকা প্রদর্শন এবং মনিটরিং টিমের মাধ্যমে বিপণন ও বিতরণ ব্যবস্থায় আরও শৃঙ্খলা আনতে সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানান বাপন।

তিনি মনে করেন, প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকেও এতে যুক্ত করতে হবে।

খামারিদের বাড়তে থাকা ব্যয় কমাতে আমদানি কর হ্রাস, নীতিগত নমনীয়তা বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে সাময়িক ভর্তুকিসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

Most Popular