Thursday, September 24, 2026
Homeখেলাপ্রতিবাদের মাসুলই কি গুনছেন আকবর আলী?

প্রতিবাদের মাসুলই কি গুনছেন আকবর আলী?

ক্রিকেটে দল নির্বাচনের মূল ভিত্তি হওয়ার কথা ফর্ম, ফিটনেস, দলের ভারসাম্য আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। এই মাপকাঠির কোনো একটিতে থাকার কথা থাকলেও কোনো খেলোয়াড় যখন হঠাৎ গায়েব হয়ে যান, তখন আড়ালে অন্য কোনো নাটকের গন্ধ পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে আকবর আলীকে নিয়ে ঠিক এই প্রশ্নেরই জন্ম হয়েছে। ঘরোয়া ক্রিকেটের অত্যন্ত পরিচিত এই অধিনায়ককে সাম্প্রতিক সফরগুলোতে কোনো দলেই দেখা যায়নি। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এইচপি, ইমার্জিং আর ‘এ’দলের হয়ে প্রায় ৬৩ জন ক্রিকেটার অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করেছেন। একের পর এক দল সামলাতে গিয়ে নির্বাচকেরা ঘরোয়া ক্রিকেটের একদম গভীর পর্যন্ত হাতড়েছেন—অনেক আনকোরা খেলোয়াড়ও ডাক পেয়েছেন, এমনকি স্বল্প সময়ের নোটিশে অনেককে এক দেশ থেকে অন্য দেশেও পাঠানো হয়েছে।

অথচ ২৪ বছর বয়সী এই কিপার-ব্যাটার, যার ঘরোয়া ক্রিকেটে লম্বা অভিজ্ঞতা রয়েছে, কোনো সফরেই জায়গা পাননি। এই সময়ে তিনি ইংল্যান্ডে ক্লাব ক্রিকেট খেলে দিন কাটিয়েছেন। বিশাল এই সফরসূচির মাঝে আকবরের এভাবে পুরোপুরি হাওয়া হয়ে যাওয়াটা বেশ চোখে পড়ার মতোই।

শুধু সাম্প্রতিক ফর্মের বিচারে এই সিদ্ধান্তকে একেবারে অমূলক বলা যায় না—সংখ্যাগুলো খুব যে চমকপ্রদ, তা নয়। ২০২৫-২৬ ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ৯ ইনিংসে ২৪.১১ গড়ে ২১৭ রান করেছেন, তবে স্ট্রাইক রেট ছিল নজরকাড়া (১১৯.২৩)। এ ছাড়া প্রাইম ব্যাংককে লিগে তৃতীয় স্থান পোক্ত করার ক্ষেত্রেও অধিনায়ক হিসেবে তার ভূমিকা ছিল।

তবে হিসাবটা শুধু এই কয়েকটা ম্যাচ দিয়ে শেষ হয় না।

গত এপ্রিলে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে (বিসিএল) উত্তরাঞ্চলের হয়ে ১২১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে দলকে ১০ উইকেটের জয় এনে দেন আকবর। এর আগে রংপুর বিভাগকে ঘরোয়া ক্রিকেটের জোড়া শিরোপা জেতান অধিনায়ক আকবর নিজেই; যেখানে এনসিএলের চার দিনের চার ম্যাচে ১৪৪ রান এবং টি-টোয়েন্টি সংস্করণের নয় ম্যাচে ২০৩ রান করেন।

এই পরিসংখ্যানে এটা চূড়ান্ত হয় না যে আকবরকে দলে রাখতেই হবে। তবে যখন অন্য কিপার-ব্যাটারদের সুযোগের পর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তখন আকবরের প্রতিটি দল থেকে বাদ পড়াটা অবশ্যই যৌক্তিক প্রশ্ন তোলে।

এর সঙ্গে অধিনায়কত্বের বিষয়টা তো আছেই।

২০২০ সালে বাংলাদেশ দলকে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জেতানো থেকে শুরু করে গত বছর কাতারে ‘এশিয়া কাপ রাইজিং স্টার্স’-এ বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দেওয়া—বর্তমান ব্যাটার হিসেবে তার ফর্ম যা-ই হোক, নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা ও ক্রিকেটীয় বিচক্ষণতা তার বড় শক্তির জায়গা।

প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার একসময় দাবি করেছিলেন, আকবর এখনও জাতীয় দলের পরিকল্পনায় আছেন এবং তিনি কী করতে পারেন তা সবাই জানে। তবে এই আশ্বাসই একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়—আকবর যদি সত্যিই তাদের পরিকল্পনায় থাকেন, তবে একসঙ্গে এতগুলো দল যখন বিদেশে পাঠানো হলো এবং ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে ঢালাওভাবে খেলোয়াড়দের নেওয়া হলো, তখন তিনি আড়ালেই রয়ে গেলেন কীভাবে?

উত্তর না থাকা এই প্রশ্নে স্বাভাবিকভাবে গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে, বাদ পড়ার কারণটা হয়তো মাঠের খেলার বাইরে অন্য কিছু। কিন্তু এই ধারণার সূত্রপাত কোথায়?

আকবর আলী ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। জানা যায়, ক্রিকেটারদের নানা দাবি-দাওয়া সংক্রান্ত আলোচনায় সংগঠনের ভেতর মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। নির্ভরযোগ্য বেশ কজন ক্রিকেটারের মতে, কিছু নীতিগত বিষয়ে আকবর ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন—যা সংগঠনের প্রভাবশালী কর্তারা ভালোভাবে নেননি।

এমন খবরও চাউর হয়েছে যে, প্রাথমিক বিবেচনায় কয়েকটি সফরের তালিকায় আকবরের নাম থাকলেও পরে অলিখিত কারণে তা ছেঁটে ফেলা হয়।

সাম্প্রতিক এক সংবাদ সম্মেলনে আকবরের মুখোমুখি এই প্রশ্নটি আসবেই, সেটাই ছিল স্বাভাবিক। আকবর অবশ্য অত্যন্ত কৌশলী অবস্থান নিয়ে ‘ষড়যন্ত্র’-এর খবর উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে সব সফর থেকে এভাবে বাদ পড়াটা যে তাকে কষ্ট দিয়েছে, তা তিনি বিনাবাক্যে স্বীকার করেছেন।

তার এই প্রতিক্রিয়া খুবই স্বাভাবিক। ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে সত্যিটা প্রকাশ্যে বলে বাড়তি জটিলতা নিশ্চয়ই তিনি ডেকে আনতে চান না। কিন্তু ক্রিকেটারদের আড়ালে বলা কথাগুলো যদি সত্যি হয়—অর্থাৎ ভিন্নমত প্রকাশ করলে ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এই ভয়ে ক্রিকেটাররা যদি মুখ গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন—তবে সমস্যাটা আর কেবল আকবর আলীর একার থাকে না; সেটা গিয়ে ঠেকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের পুরো কাঠামোগত সংস্কৃতির ওপর।

Most Popular