Tuesday, May 12, 2026
Homeবিদেশহান্তাভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশগুলো কী

হান্তাভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশগুলো কী

একটি প্রমোদতরীতে প্রাণঘাতী হান্তাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জাহাজের যাত্রীরা নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ায় ভাইরাসটি আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে কি না, তা নিয়ে সতর্ক রয়েছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো।

সাধারণত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ানো এই বিরল ভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকি কমানো এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের সুরক্ষিত রাখতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তাসংস্থা এএফপি।

ডব্লিউএইচওর মহামারি প্রস্তুতি ও প্রতিরোধবিষয়ক পরিচালক মারিয়া ভ্যান কেরখোভ জানিয়েছেন, ডাচ পতাকাবাহী এমভি হন্ডিয়াস জাহাজটি রোববার ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর পর তাতে থাকা প্রায় ১৫০ জন যাত্রীকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

ডব্লিউএইচও তাদের সবাইকে ছয় সপ্তাহ কোয়ারেন্টিনের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখার সুপারিশ করেছে।

সোমবার এএফপিকে ডব্লিউএইচও জানায়, যারা আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসেছেন এবং নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছেন, তাদের সর্বশেষ সম্ভাব্য সংস্পর্শের পর পুরো ৪২ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। এই সময় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে এবং বাসা বা বিশেষায়িত কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন উপসর্গ পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

সংস্থাটি আরও জানায়, কোয়ারেন্টিনের সময় গণনা শুরু হয়েছে ‘১০ মে’ থেকে।

ডব্লিউএইচও বলেছে, যদি কোনো প্রাথমিক উপসর্গ বা হঠাৎ শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্রুত স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে এবং চিকিৎসা মূল্যায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে।

মারিয়া ভ্যান কেরখোভের মতে, ৪২ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে অ্যান্ডিজ ধরনের হান্তাভাইরাসের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সুপ্তকাল বিবেচনায়।

বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য এই অ্যান্ডিজ ভাইরাসকেই দায়ী মনে করা হচ্ছে। এটিই হান্তাভাইরাসের একমাত্র পরিচিত ধরন, যা মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে।

ডব্লিউএইচওর এপিডেমিওলজি অ্যান্ড অ্যানালিটিকস ফর রেসপন্স বিভাগের প্রধান অলিভিয়ে লে পোলাঁ বলেন, আক্রান্তরা এখনো ‘রোগের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে’ আছেন। তাই উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের আলাদা করে রাখা প্রয়োজন।

ডব্লিউএইচও দেশগুলোকে স্বাস্থ্যসমন্বয় জোরদার করা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং সন্দেহভাজন রোগীদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।

মারিয়া ভ্যান কেরখোভে বলেন, যেসব সম্ভাব্য রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং যাদের সন্দেহভাজন রোগী হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে, তাদের সম্পর্কে আরও তথ্য পেতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করছে ডব্লিউএইচও।

সংস্থাটি বলছে, প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হওয়ার আগেই যারা জাহাজ ছেড়েছিলেন এবং পরে অন্যদের সংস্পর্শে এসেছেন, তারাও উচ্চ ঝুঁকিতে থাকতে পারেন।

ডব্লিউএইচওর ভাষ্য, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে থাকতে পারেন—একই কেবিনে থাকা ব্যক্তি, ঘনিষ্ঠ সঙ্গী, দীর্ঘ সময় কাছাকাছি ঘরোয়া পরিবেশে থাকা ব্যক্তি, সুরক্ষা ছাড়া সংস্পর্শে আসা স্বাস্থ্যকর্মী এবং যথাযথ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া দূষিত বস্তু বা দেহতরল ব্যবস্থাপনায় জড়িত ব্যক্তি।

সংস্থাটি পরিস্থিতি সম্পর্কে আক্রান্ত ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষের কাছে ‘স্পষ্ট ও স্বচ্ছ তথ্য’ তুলে ধরারও আহ্বান জানিয়েছে।

যদিও অধিকাংশ দেশ ডব্লিউএইচওর নির্দেশনা অনুসরণ করছে, তবে বিভিন্ন দেশে আলাদা স্বাস্থ্যবিধি গ্রহণ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জয় ভট্টাচার্য বলেছেন, দেশে ফেরা ১৭ জন মার্কিন যাত্রীকে বাধ্যতামূলকভাবে কোয়ারেন্টিনে রাখা নাও হতে পারে।

তিনি বলেন, ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় যাত্রীরা নিজ বাড়িতে যেতে পারবেন, তবে এমন ব্যবস্থা করা হবে যাতে পথে অন্য কেউ সংক্রমণের ঝুঁকিতে না পড়েন।

তবে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম তদারক করতে টেনেরিফে অবস্থান করা ডব্লিউএইচও মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসাস সতর্ক করে বলেছেন, ওই নীতিতে ‘ঝুঁকি থাকতে পারে’।

জার্মানি, ব্রিটেন, সুইজারল্যান্ড ও গ্রিস ৪৫ দিনের কোয়ারেন্টিন বেছে নিয়েছে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্স যথাক্রমে ন্যূনতম তিন সপ্তাহ ও দুই সপ্তাহ পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা পরে বাড়ানো হতে পারে।

বর্তমানে হান্তাভাইরাসের জন্য কোনো অনুমোদিত চিকিৎসা নেই। এই ভাইরাসে মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

তবে ডব্লিউএইচও বলেছে, ‘প্রাথমিক সহায়ক চিকিৎসা এবং দ্রুত পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালে পাঠানো হলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়তে পারে।’

সংস্থাটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সব রোগীর ক্ষেত্রে নিয়মিত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হাত পরিষ্কার রাখা, আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা।

ডব্লিউএইচও আরও বলেছে, সন্দেহভাজন বা নিশ্চিত রোগীদের চিকিৎসার সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব চিকিৎসা পদ্ধতিতে বাতাসে ক্ষুদ্র কণিকা বা অ্যারোসল ছড়িয়ে পড়তে পারে, সেসব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

Most Popular