Sunday, August 23, 2026
Homeবাংলাদেশমাঠপর্যায়ে দ্বিধায় পুলিশ: ‘ঊর্ধ্বতনরা কি আমাদের রক্ষা করবেন?’

মাঠপর্যায়ে দ্বিধায় পুলিশ: ‘ঊর্ধ্বতনরা কি আমাদের রক্ষা করবেন?’

ঢাকার কল্যাণপুরে গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি একটি রিকশার গ্যারেজ দখল করে সেখানে রাখা ১৬টি রিকশা বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে একদল লোকের বিরুদ্ধে।

রিকশা গ্যারেজের মালিক মো. শামীম (৩১) গত ১৮ আগস্ট দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘পরে ওই রিকশাগুলোর বেশিরভাগই চুরি হয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ওই ঘটনায় মিরপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু বারবার থানায় গিয়ে তাগাদা দেওয়ার পরও মামলা হয়নি।

তার অভিযোগ, এই দলটির নেতৃত্বে ছিল দুজন স্থানীয় ব্যক্তি—যাদের একজন নিজেকে যুবদল কর্মী এবং অন্যজন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা হিসেবে পরিচয় দেন।

শামীম তিন বছর আগে দেড় লাখ টাকায় গ্যারেজটি নেন। এটি সংস্কারের পেছনে তার খরচ হয় সাড়ে তিন লাখ টাকা। এখন গ্যারেজটি আর তার নিজের কাছে নেই।

তিনি বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। বস্তির জায়গা-জমি এভাবেই দখল হয়। কিন্তু পুলিশের কাছে গেলে শুধু ফাঁকা প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়।’

দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে কর্মরত কয়েকজন পুলিশ সদস্য জানান, কোনো ঘটনায় প্রভাবশালী কেউ যুক্ত থাকলে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বরত পুলিশ শক্ত অবস্থান নিতে অনিহা প্রকাশ করে।

মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, কোনো গ্রেপ্তার বা বিতর্ক তৈরি হতে পারে এমন পরিস্থিতিতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগে তারা এখন সম্ভাব্য পরিণতির কথা ভাবেন। কোনো সমস্যায় পড়লে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশে পাওয়া যাবে কি না সেটাও বিবেচনা করতে হয়।

মিরপুরের এরকম আরেকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সমস্যার যখন জটিল মনে হয়, তখন পুলিশ প্রায়ই মামলা নিতে গড়িমসি করে বা এড়িয়ে যায়।

মধ্য পাইকপাড়ার পান্না বেগম জানান, গত ২৯ জুলাই ১৫ থেকে ২০ জন সন্ত্রাসী তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে তার স্বামী ও ভাইকে মারধর করে এবং মোট ৭৫ লাখ টাকার দুটি ইসলামী ব্যাংক চেকে সই করতে বাধ্য করে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, পরে তার স্বামীকে তাদের চারতলা ভবনের তিনটি ফ্ল্যাট সংক্রান্ত দলিলেও সই করতে বাধ্য করা হয়।

পান্নার অভিযোগ, পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকার করে এবং কুখ্যাত অপরাধীদের জড়িত থাকার অজুহাতে পরিবারকে আপস করার জন্য চাপ দেয়। ফলে তিনি আদালতের আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

মিরপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাহমুদ নবী এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।

ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার জানান, যদি কোনো থানা মামলা নিতে অস্বীকার করে, তবে অভিযোগকারীরা আঞ্চলিক সহকারী কমিশনার (এসি), অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) অথবা ডিসির কাছে যেতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে এমন অভিযোগ নিয়ে কেউ আসেনি। সাধারণত আমলযোগ্য অপরাধ হলে সেটি মামলা হিসেবে নেওয়া হয়। আমি এই ঘটনার বিস্তারিত জানি না, তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’

‘ঊর্ধ্বতনরা কি আমাদের রক্ষা করবেন?’

পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিওএম) ইউনিটের একজন এএসআই জানান, যখন কোনো ঘটনায় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত থাকেন অথবা মব তৈরির ঝুঁকি থাকে, তখন পুলিশ সদস্যরা গ্রেপ্তার বা ব্যবস্থা নিতে প্রায়ই ইতস্তত করেন।

তিনি বলেন, ‘সবসময় মনে একটা প্রশ্ন ঘোরে—আজ যদি আমরা কোনো ব্যবস্থা নিই আর পরে ঝামেলা তৈরি হয়, তবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কি আমাদের রক্ষা করবেন?’

কাফরুল থানার একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই) বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঠিক পরের সময়ের তুলনায় পুলিশ এখন অনেক বেশি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তবে কঠিন বা জটিল অভিযানের ক্ষেত্রে এখনো কিছুটা অনীহা রয়ে গেছে।

পলাতক আসামি বা মাদক সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশের বিভিন্ন দল মাঝেমধ্যে হুমকির মুখে পড়ে এবং ঊর্ধ্বতনরা কখনো কখনো তাদের পিছু হটার পরামর্শ দেন।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘যদি কোনো পুলিশ সদস্য সঠিক কাজ করেন, তবে ঊর্ধ্বতনদের অবশ্যই তার পাশে দাঁড়াতে হবে।’

সহকারী কমিশনার (এসি) পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা আরেকটি দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছেন। তা হলো—বর্তমানে মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দায়িত্বরত কিছু কর্মকর্তার বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা বেশ সীমিত।

তিনি বলেন, থানার নেতৃত্বে আসা কিছু কর্মকর্তা তাদের কর্মজীবনের অনেকটা সময় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা রিজার্ভ ফোর্সে কাটিয়েছেন। বড় ধরনের অপরাধের তদন্ত বা জটিল অপারেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা অনেক কম।

তিনি মনে করেন, এক্ষেত্রে তদন্তগুলো অনেক সময় কেবল মাঠপর্যায়ের সন্দেহভাজনদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে; বড় অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারীদের পর্যন্ত আর পৌঁছানো সম্ভব হয় না।

তবে ডিএমপির একজন উপ-কমিশনার (ডিসি) বলেন, দেড়-দুই বছর আগের তুলনায় পুলিশ বাহিনী এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। পুলিশ এখন নিয়মিত সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করছে এবং মামলার রহস্যও উদ্ঘাটন করছে।

তিনি বলেন, নতুন দায়িত্ব পাওয়া ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) আরও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। এ ছাড়া অভিজ্ঞ, দক্ষ এবং সাহসী কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দায়িত্ব দেওয়া উচিত।

অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তোলা ছবি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনা এবং কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার বিষয়টি পুলিশের মনোবলের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তোলা ছবিগুলো পরবর্তী সময়ে সামাজিকমাধ্যমে প্রচার করে কিছু কর্মকর্তাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গত ১৭ আগস্ট বলেন, সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ‘দৃশ্যমান উন্নতি’ হয়েছে।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, যে কর্মকর্তারা বেআইনি কাজে জড়িত, তাদের অবশ্যই আইনের মুখোমুখি করতে হবে। তবে যারা আইন মেনে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের হুমকি এবং মব প্রেশার থেকে সুরক্ষা দেওয়াও প্রয়োজন।

Most Popular