Sunday, August 23, 2026
Homeবিদেশযুক্তরাজ্যের বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের পেছনে ইরানের সাইবার হামলা?

যুক্তরাজ্যের বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের পেছনে ইরানের সাইবার হামলা?

সাইবার হামলায় চার দিন বন্ধ ছিল যুক্তরাজ্যের বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই ঘটনার নেপথ্যে আছে ইরানি হ্যাকাররা—এমন দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। 

গতকাল শনিবার এই তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ।

নজিরবিহীন এই সাইবার হামলাকে এ ধরনের আক্রমণের মধ্যে সবচেয়ে সফল বলে মনে করা হচ্ছে।

ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের পক্ষ থেকে আসা সাইবার হামলার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে এ ধরনের কোনো স্থাপনা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম।

একইসঙ্গে এটাকে এই ধারার সবচেয়ে সফল সাইবার হামলা আখ্যা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

দ্য টেলিগ্রাফ জানতে পেরেছে, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পানি অবকাঠামোর বিরুদ্ধে চালানো ধারাবাহিক সাইবার হামলার সময়ই এই ঘটনাটি ঘটে। ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ১২টি অঙ্গরাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিষয়টি হোয়াইট হাউসে উদ্বেগ তৈরি করে।

নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা কোন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি আক্রান্ত হয়েছিল, তা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

জানা গেছে, কেন্দ্রটি চার দিন অচল ছিল। এ সময় কর্মীরা সেটা আবার চালু করার উদ্যোগ নেন।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি তুলনামূলকভাবে ছোট ছিল এবং এটি বন্ধ থাকায় যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহ বা বিদ্যুৎ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি।

ঘটনার পর সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীদের বিষয়টি অবহিত করে এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে পরামর্শ, নির্দেশনা ও পরবর্তী করণীয় জানিয়ে বার্তা দেয়।

ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার (এনসিএসসি)-এর কাজ মূলত বিদেশ থেকে আসা হুমকি থেকে জাতীয় অবকাঠামোকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শ দেওয়া।

ব্রিটিশ ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করে আসছে যে রাশিয়া, চীন, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সরকারি সংস্থাগুলোতে প্রতিদিনই ধারাবাহিক সাইবার হামলা চালাচ্ছে।

এর আগে বড় ধরনের সাইবার হামলায় যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) ব্যবস্থাপনা, স্কুল এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনকেন্দ্র অচল হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার গাড়ির উৎপাদন বন্ধের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য।

বিদেশি হ্যাকার গোষ্ঠী খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকেও গ্রাহকদের তথ্য চুরি করেছে বলে জানা গেছে।

গত বছরও এ ধরনের হামলা হয়েছে। এ ছাড়া ইলেক্টোরাল কমিশনের ভোটারদের তথ্যও চুরি করেছে হ্যাকাররা।

জাতীয় অবকাঠামোতে সাইবার হামলা নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠলেও ধারণা করা হচ্ছে, এবারই প্রথম যুক্তরাজ্যের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি অচল করতে সক্ষম হয়েছে হ্যাকাররা।

বিশ্লেষকদের মত, এই হামলাটি ‘প্রতীকী’ হতে পারে। যুক্তরাজ্যের সাধারণ, বেসামরিক জনগণের ক্ষতির উদ্দেশে এই হামলা চালায়নি হ্যাকাররা। বরং, ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী বা আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা এই হামলার মাধ্যমে এটাই প্রমাণ করেছে যে চাইলে তারা যুক্তরাজ্যের সংবেদনশীল অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে এবং এগুলো বন্ধ করে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে চালানো সাইবার হামলায় কয়েক ডজন বর্জ্যপানি শোধনাগার আক্রান্ত হয়। এতে বন্যা দেখা দেয়, কলের পানির চাপ কমে যায় এবং কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের পান করার আগে পানি ফুটিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেয়।

২৬ জুলাই মিনেসোটা অঙ্গরাজ্য থেকে প্রথম হামলার খবর পাওয়া যায়। এরপর মিশিগান, জর্জিয়া, সাউথ ডাকোটা ও নিউ জার্সিতে একই ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটে।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এসব ঘটনার জন্য ‘ক্ষতিকর সাইবার হামলাকারীদের’ দায়ী করে।

তবে পরে মার্কিন সরকারি সূত্রগুলো বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে জানায়, এসব হুমকির উৎস তেহরান হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরান সাইবার হামলা ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিমান হামলা শুরু করার পর এ ধরনের হামলা আরও বেড়েছে।

জার্মানি, পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়ায় ইরানের সন্দেহভাজন সাইবার হামলার খবর পাওয়া গেছে। তবে সাধারণত ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশই এসব হামলার মূল লক্ষ্য।

মার্চে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনার পরামর্শ দেয় এনসিএসসি। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী রিচার্ড হর্ন জুনে বলেন, আগের এক বছরে তারা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর ২০০টির বেশি হামলা মোকাবিলা করেছে।

এনসিএসসি সাধারণত পৃথক সাইবার হামলার ঘটনার বিষয়ে কোনো বিবৃতি দেয় না।

যুক্তরাজ্যের ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার ঘটনা নিয়েও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সংস্থাটি।

বিদেশি প্রতিপক্ষের ক্ষতিকর সাইবার হামলা মোকাবিলায় যুক্তরাজ্য একেবারেই প্রস্তুত নয় বলে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যক্রম তদারককারী ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি কমিটি গত বছর এক প্রতিবেদনে মত দিয়েছিল, ব্রিটিশ অবকাঠামোয় ইরানি সাইবার হামলার সম্ভাবনা ‘কম’।

তবে কমিটি সতর্ক করে বলেছিল, ইরান সাইবার যুদ্ধে বেশ শক্তিশালী। দেশটি হ্যাকার গোষ্ঠীগুলোর পেছনে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে, যেগুলোর প্রতিটিতে শত শত সদস্য রয়েছে।

গত মাসে যুক্তরাজ্যের মন্ত্রিসভা দপ্তর প্রকাশিত সরকারি ঝুঁকি মূল্যায়নে বলা হয়, দেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর ওপর গুরুতর ও সফল সাইবার হামলার ঝুঁকি ৫ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে।

এসব হামলাকে এআই প্রযুক্তি আরও গতিশীল করতে পারে বলেও ওই মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সরকারের এক সূত্র জানান, এত ছোট মাত্রার সাইবার হামলার তথ্য প্রকাশে তারা আইনগতভাবে বাধ্য নন। জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতার তুলনায় ওই ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র চার দিন বন্ধ থাকা একেবারেই উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা নয়—দাবি করেন ওই সূত্র।

ব্রিটিশ সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের জ্বালানি ব্যবস্থা অত্যন্ত বলিষ্ঠ। অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখতে এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করতে আমরা জ্বালানি খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই ঘটনাটি একটি ছোট আকারের জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রকে প্রভাবিত করেছে। কোনো পর্যায়েই যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি হয়নি।’
 

Most Popular