Thursday, August 20, 2026
Homeবাংলাদেশবাংলাদেশের আগের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনগুলো কেমন ছিল

বাংলাদেশের আগের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনগুলো কেমন ছিল

বাংলাদেশে আজ ১৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে দেশের প্রধান নির্বাচনের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পদে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে।

এখন পর্যন্ত দেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছে ১২ বার। এর মধ্যে তিনবার জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছেন। আর নয়বার সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।

এই নয়টি পরোক্ষ নির্বাচনের মধ্যে ১৯৯৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আটটিই হয়েছে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। অর্থাৎ, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।

সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই ধারা ধীরে ধীরে নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে অনেকটা আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করেছে। এর অন্যতম কারণ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য যে দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হতে পারে।

দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয় ১৯৭৪ সালের ২৪ জানুয়ারি। সেটা ছিল পরোক্ষ নির্বাচন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

এর প্রায় চার বছর পর ১৯৭৮ সালে হয় দেশের প্রথম সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। অর্থাৎ, প্রথমবারের মতো সাধারণ ভোটাররা সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ভোট দেন।

ওই নির্বাচনে মোট ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে মূল লড়াই ছিল জিয়াউর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ বাহিনীর প্রধান জেনারেল এম এ জি ওসমানীর মধ্যে।

জিয়াউর রহমান তখন ছয়টি দলের জোট বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের প্রার্থী ছিলেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগসহ পাঁচটি দলের জোট গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট ওসমানীকে সমর্থন করে।

ওই নির্বাচনে জিয়াউর রহমান পান ১ কোটি ৫৭ লাখ ৩৩ হাজার ৮০৭ ভোট। ওসমানী পান ৪৪ লাখ ৫৫ হাজার ২০০ ভোট।

এই নির্বাচনে জিয়াউর রহমান প্রথমবারের মতো ‘ধানের শীষ’ প্রতীক ব্যবহার করেন। পরে এটিই তার প্রতিষ্ঠিত বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক হয়।

১৯৮১ সালের ৩০ মে একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।

ওই বছরের ১৫ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে জয় পান সাত্তার।

নির্বাচনে ৮৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। পরে কয়েকজন প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন এবং কয়েকজন ‘প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ান’। শেষ পর্যন্ত ৩১ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

সাত্তারের সবচেয়ে কাছের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ড. কামাল হোসেন।

সাত্তার পান ১ কোটি ৪২ লাখ ৩ হাজার ৯৫৮ ভোট। কামাল হোসেন পান ৫৬ লাখ ৩৬ হাজার ১১৩ ভোট। তবে বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি সাত্তার। ১৯৮২ সালের মার্চে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। ১৯৮৩ সালে এরশাদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।

এরপর ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর হয় দেশের তৃতীয় এবং শেষ সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ওই নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো।

এরশাদ তখন ওই বছরের শুরুতে গঠিত জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। তার সঙ্গে আরও ১২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

এরশাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মুহাম্মদুল্লাহ, যিনি ‘হাফেজ্জী হুজুর’ নামেও পরিচিত। এরশাদ পান ২ কোটি ১৭ লাখ ৯৫ হাজার ৩৩৭ ভোট। মুহাম্মদুল্লাহ পান ১৫ লাখ ১০ হাজার ৪৫৬ ভোট।

এরশাদের পতনের পর গণতন্ত্রের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ আবার সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যায়।

এরপর এখন পর্যন্ত নয়বার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছে। সবগুলোই হয়েছে সংসদ সদস্যদের ভোটে। তবে এর মধ্যে সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল মাত্র একবার।

১৯৯১ সালের অক্টোবরে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে হারিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বিশ্বাস পান ১৭২ ভোট। চৌধুরী পান ৯২ ভোট।

তবে ওই নির্বাচনও পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলক ছিল না। জাতীয় পার্টি নির্বাচন বর্জন করে। জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ আরও কয়েকটি দল ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসনের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, তখন সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, তা নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল।

১৯৯১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জারি করা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন (সংশোধন) অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সংসদের কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে ওই নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে।

তবে ৩ অক্টোবর ১৯৯১ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশের মাধ্যমে ওই বিধানটি বাতিল করা হয়।

এরপরের সব রাষ্ট্রপতি নির্বাচনই হয়েছে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ১৯৯৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরাই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সাহাবুদ্দীন আহমেদ, ২০০১ সালে বিএনপির একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ২০০২ সালে বিএনপির ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের জিল্লুর রহমান, ২০১৩ ও ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের আবদুল হামিদ এবং ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, আগের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনগুলো ছিল অনেকটাই একতরফা এবং প্রায়ই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হয়েছে। এবার অন্তত সত্যিকারের একটি নির্বাচন হচ্ছে। এটাও একটা ইতিবাচক পরিবর্তন।

আলীম আরও বলেন, বাংলাদেশে সংসদীয় ব্যবস্থা চালু থাকায় সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। ফলে নির্বাচনের ফলাফল অনেকটাই আগে থেকে নির্ধারিত থাকে। আপাতত রাষ্ট্রপতির ক্ষমতারও কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।

তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়তে পারে। এতে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।

তার মতে, এই দিক থেকে এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আগের তুলনায় বাড়তি রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করছে।

 

Most Popular