Tuesday, August 18, 2026
Homeখেলা‘বাংলাদেশ সেরাদের একটি’: আর্জেন্টিনা নিয়ে বাংলাদেশের উন্মাদনা দেখে যা বললেন ক্যানিজিয়া

‘বাংলাদেশ সেরাদের একটি’: আর্জেন্টিনা নিয়ে বাংলাদেশের উন্মাদনা দেখে যা বললেন ক্যানিজিয়া

আর্জেন্টিনার ফুটবল কিংবদন্তি ক্লাদিও ক্যানিজিয়া সোমবার ঢাকার ফোর্টিস ফুটবল একাডেমিতে দেখা করেছেন বাংলাদেশের উঠতি ফুটবলারদের সঙ্গে। পিলো চিপস ঢাকা ইন্টারস্কুল চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ২০২৬-এর সম্মানিত অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ সফরে এসে সেখানে উপস্থিত হন তিনি। নিজের দুর্দান্ত গতি এবং দিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে আইকনিক জুটির জন্য খ্যাত সাবেক বিশ্বকাপ তারকা এরপর পুরস্কার বিতরণ করেন। পরে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশের ফুটবল, দেশের আর্জেন্টিনা-প্রীতি, ম্যারাডোনা, মেসি এবং আরও নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন তিনি।

আর্জেন্টিনার এই কিংবদন্তির কথোপকথনের উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন? আর আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের যে আবেগ, সেটিকে কীভাবে দেখছেন?

ক্লাদিও ক্যানিজিয়া: আমি খুব উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছি। এখানকার মানুষ দারুণ, আর আমি বাংলাদেশকে উপভোগ করছি, কারণ এখানকার মানুষ ভীষণ আবেগপ্রবণ। আমি জানতাম, বাংলাদেশের অনেক মানুষ আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করেন। বিশেষ করে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ এবং দিয়েগো ম্যারাডোনার জাতীয় দলে থাকার সময় থেকেই। টেলিভিশনে আমি সেসব ছবি দেখেছি, তাই বিষয়টি আমার কাছে বিস্ময়ের ছিল না। তবে প্রথমবারের মতো এখানে এসে মানুষের এতটা কাছাকাছি গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারা আমার জন্য দারুণ আনন্দের। আর্জেন্টিনার জয়, বিশেষ করে সর্বশেষ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সাফল্য তারা যেভাবে উপভোগ করেছে, সেটি দেখতে সত্যিই অসাধারণ লেগেছে।

প্রশ্ন: আপনার কি মনে হয়, বাংলাদেশ ২০৩০ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে?

ক্যানিজিয়া: আমরা জানি, বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া সব সময়ই কঠিন। আমাকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তাই আমি আশা করি, তারা আগের চেয়ে ভালো করতে পারবে। সারা বিশ্বে অনেক দল আছে এবং অনেক দলই উন্নতি করছে। এখন বিশ্বকাপে ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে, ভবিষ্যতে হয়তো ৬৪টি দলও খেলবে। তাই আমরা আশা করতেই পারি, বাংলাদেশও বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাবে।

পথটা সহজ নয়। এটি নির্ভর করে কোচ, সরকার, পরিবেশ, আপনারা কীভাবে কাজ করছেন এবং আরও প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি করতে পারছেন কি না, এসবের ওপর। অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। তবে আমি আশা করি, এটি সম্ভব হবে। কেন নয়?

প্রশ্ন: দিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে আপনার সেই বিখ্যাত চুম্বন এবং ২০০২ বিশ্বকাপে আপনার লাল কার্ডের ঘটনা সম্পর্কে বলুন।

ক্যানিজিয়া: দিয়েগো আমার বন্ধু ছিল, আর আমরা আর্জেন্টাইনরা তাকে ভীষণ মিস করি। জাতীয় দলে আমরা বহু বছর একসঙ্গে খেলেছি। আমি বয়সে একটু ছোট হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তাকে দেখে বড় হয়েছি। পরে বোকা জুনিয়র্সেও আমরা একসঙ্গে খেলেছি। আর সেই চুমুর ব্যাপারটি ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। সে করতে চেয়েছিল, আমরা করেছি। বন্ধুদের মধ্যে সেটি ছিল শুধুই বন্ধুত্বপূর্ণ একটি চুমু।

২০০২ সালের লাল কার্ডের ঘটনাটি অবিশ্বাস্য ছিল। এটি ছিল রেফারির ভুল। আমরা সবাই ভুল করি, রেফারিরাও ভুল করেন। আমি তখন বেঞ্চে বসে থাকা অবস্থায় লাল কার্ড দেখেছিলাম। কেন এমন হয়েছিল, আমি জানি না। তবে ঘটনাটি ভয়াবহ ছিল। আমার জন্য এটি মোটেও ভালো কিছু ছিল না। কিন্তু এটি আমার ভুল ছিল না, এটি ছিল রেফারির ভুল।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার অনেক সমর্থক রয়েছে। আপনি কি তাদের এই আবেগ অনুভব করতে পারেন?

ক্যানিজিয়া: আমি এতে অবাক হইনি, কারণ ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকেই আমি বিষয়টি সম্পর্কে জানতাম। প্রথমে আপনি ভাবতেই পারেন, এটা পাগলামি। কারণ বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনা একে অপরের থেকে এত দূরে, তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যও আলাদা। কিন্তু বাংলাদেশ আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করে, এটা শুনতে সত্যিই দারুণ লাগে।

আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ সেরাদের একটি। কারণ এখানে এত মানুষ ভীষণ আবেগ দিয়ে সমর্থন করে। আর্জেন্টিনা যখন কষ্ট পায়, তারাও কষ্ট পায়। তারা শুধু জয় উদ্‌যাপন করে না। সর্বশেষ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যখন প্রায় বাদ পড়ে যাওয়ার অবস্থায় ছিল, তখন টেলিভিশনে আমি বাংলাদেশের মানুষের মুখ দেখেছি। এরপর মিশরের বিপক্ষে ম্যাচের পর রাস্তায় মানুষের উচ্ছ্বাসও দেখেছি। এটা ছিল পাগলাটে, কিন্তু আমাদের জন্য দারুণ ব্যাপার।

আর্জেন্টিনার সমর্থক সারা বিশ্বেই আছে। ব্রাজিল ও ইতালির মতো বড় দলগুলোরও বিশ্বজুড়ে অনেক সমর্থক রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মতো নয়।

প্রশ্ন: ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার হারে আপনি কতটা হতাশ হয়েছিলেন?

ক্যানিজিয়া: অবশ্যই আমি হতাশ হয়েছিলাম, কারণ আর্জেন্টিনা হেরেছে। কিন্তু সত্যি বলতে, আমি মনে করি স্পেনেরই জেতা প্রাপ্য ছিল। ১২০ মিনিটজুড়ে তারা ভালো খেলেছে। আর্জেন্টিনার অনেক খেলোয়াড় চোটে ছিল এবং দুটি ১২০ মিনিটের ম্যাচ খেলার পর তারা ক্লান্তও ছিল। ফলে ভালো অবস্থায় তারা ফাইনালে পৌঁছাতে পারেনি। স্পেন ভালো খেলেছে এবং বিশ্বকাপ জেতার যোগ্যতা তাদের ছিল।

প্রশ্ন: ম্যারাডোনা ও মেসির মধ্যে যদি একজনকে বেছে নিতে হয়, কাকে বেছে নেবেন?

ক্যানিজিয়া: ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিভাবান তিন খেলোয়াড়ের মধ্যে দুজনকে পাওয়ার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছে। আমার বিশ্বাস, অন্যজন ছিলেন পেলে। পেলে, ম্যারাডোনা ও মেসি, ফুটবল ইতিহাসের অসাধারণ খেলোয়াড়। আর আমরা আর্জেন্টাইনরা তাদের দুজনকে পেয়েছি। এটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং অসাধারণ একটি বিষয়।

প্রশ্ন: ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ফিফার কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা পেয়েছে, আপনি কি এমনটা বিশ্বাস করেন?

ক্যানিজিয়া: না, একেবারেই না। কোনো ষড়যন্ত্র ছিল না। আর্জেন্টিনার যেকোনো খেলোয়াড়কেই জিজ্ঞেস করুন, তারাও একই কথা বলবে। স্পেন ছিল ভালো দল এবং তাদেরই জেতা প্রাপ্য ছিল। সেমিফাইনালে তারা ফ্রান্সের চেয়ে অনেক ভালো খেলেছে। অথচ বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফ্রান্সকেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার, এমনকি হারানোর জন্য সবচেয়ে কঠিন দল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।

স্পেন সেরা দুটি দল ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনা দু’টিকেই হারিয়েছে। তাই আমি কোনো ষড়যন্ত্রে বিশ্বাস করি না।

প্রশ্ন: আপনি অসাধারণ দ্রুতগতির খেলোয়াড় ছিলেন এবং শোনা যায়, ১০০ মিটার দৌড় ১১ সেকেন্ডেরও কম সময়ে শেষ করতে পারতেন। অ্যাথলেটিকসের বদলে ফুটবলকে কেন বেছে নিয়েছিলেন? আর বাংলাদেশের জাতীয় দলের সঙ্গে কাজ করার কথা কি কখনো ভাববেন?

ক্যানিজিয়া: আমি অ্যাথলেট হতে পারতাম। ১০০ বা ২০০ মিটার দৌড়াতে পারতাম। ছোটবেলায় আমি ফুটবল খেলা শুরু করি, একই সঙ্গে অ্যাথলেটিকসও খুব ভালোবাসতাম। এখনো আমি অলিম্পিক এবং ১০০ ও ২০০ মিটারের দুর্দান্ত দৌড়বিদদের দেখতে উপভোগ করি। কিন্তু ফুটবলই ছিল আমার আসল ভালোবাসা।

ফুটবলে এবং যেকোনো খেলাতেই গতি বড় একটি সুবিধা। কিন্তু ফুটবল শুধু গতির খেলা নয়। এখানে আরও অনেক দক্ষতা প্রয়োজন। তা না হলে উসাইন বোল্ট কিংবা কার্ল লুইসও তো ফুটবল খেলতে পারতেন। শুধু গতি থাকলেই হয় না।

আর বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে বলব, আমি এখন পর্যন্ত কোনো প্রস্তাব পাইনি। যদি সুযোগ আসে, অবশ্যই আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবব। এমন একটি দলের সঙ্গে কাজ করা দারুণ হবে, যারা এগিয়ে যেতে চায় এবং আমার অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হতে চায়। তবে আমি নিজে থেকে কোনো প্রস্তাব দিচ্ছি না, এটি পরিষ্কার করে বলতে চাই, আমি নিজেকে প্রস্তাব করছি না।

তবে কেন নয়? কোচরা সব সময় বিদেশে গিয়ে কাজ করেন এবং জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন। কুরাসাওয়ের কথাই ধরুন। আমার ক্যারিয়ারের শেষ দিকে যে কোচ আমার দায়িত্বে ছিলেন, সেই ডিক অ্যাডভোকাটের অধীনেই কুরাসাও প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তাহলে এমন একটি দলের সঙ্গে কাজ করতে সমস্যা কোথায়, যে দল এখনো কখনো বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি?

Most Popular