Monday, August 17, 2026
Homeখেলা‘আপসেট’ শব্দে কেন আপত্তি লাল-সবুজের সমর্থকদের?

‘আপসেট’ শব্দে কেন আপত্তি লাল-সবুজের সমর্থকদের?

ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে রীতিমতো ধুলোয় মিশিয়ে নিজেদের টেস্ট ইতিহাসের সেরা জয়টা তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। চার দিনও লাগেনি, প্রায় সাড়ে চার সেশনেরও বেশি সময় বাকি থাকতেই ৯ উইকেটের এই বিশাল জয় উদযাপন করছে পুরো দেশ। কিন্তু উদযাপনের আবহেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দানা বেঁধেছে নতুন এক বিতর্ক। মাঠের লড়াই শেষ, এবার লড়াই চলছে অভিধানের একটি শব্দ নিয়ে—‘আপসেট’ (বা অঘটন)।

বাংলাদেশি সমর্থকদের বড় একটি অংশের আপত্তি এই ‘আপসেট’ শব্দটাতেই।

তাদের যুক্তি পরিষ্কার—টেস্টের প্রথম সেশন থেকেই ম্যাচের লাগাম ছিল টাইগারদের হাতে। পুরো চার দিন প্রতিপক্ষকে একচ্ছত্র আধিপত্যে চেপে ধরে রাখা এই জয়কে ‘অঘটন’ বললে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সকেই ছোট করা হয়। সমর্থকদের মতে, ‘আপসেট’ শব্দটা কেবল ফেভারিট অস্ট্রেলিয়ার হতাশা আর বিস্ময়কে তুলে ধরে—তারা হেরে চমকে গেছে বলেই যেন এটা অঘটন! কিন্তু বাংলাদেশ যেখানে ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্ত নিয়ন্ত্রণ করে জিতেছে, সেখানে ফলাফলের ফ্রেমিং কেন অসিদের চমকে যাওয়ার ওপর ভিত্তি করে হবে?

তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এত দাপুটে আর পরিষ্কার এক জয় কীভাবে ক্রিকেটীয় সংজ্ঞায় ‘আপসেট’ হয়? উত্তরটা লুকিয়ে আছে খেলার পরিভাষা আর অভিধানের মারপ্যাঁচে।

কেমব্রিজ ডিকশনারিতে ‘আপসেট’-এর সাধারণ অর্থ মন খারাপ বা উদ্বিগ্ন করা হলেও, খেলাধুলার জগতে এর অর্থ ভিন্ন। স্পোর্টস ডিকশনারিতে বলা আছে: ‘এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল জয়ের দৌড়ে বহুদূর এগিয়ে থাকা ফেভারিটকে হারিয়ে দেয়।’

খেলার জন্য এই ‘আপসেট’ শব্দটির ব্যবহার চমৎকার। খেলার আগের সমস্ত হিসেব-নিকাশ আর আগাম অনুমানকে এক ধাক্কায় উল্টে দেওয়ার নামই তো খেলাধুলার ‘আপসেট’।

ডারউইন টেস্ট শুরুর আগে অস্ট্রেলিয়াই ছিল নিরঙ্কুশ ফেভারিট। নিজেদের ঘরের মাঠ, পূর্ণশক্তির একাদশ; অন্যদিকে বাংলাদেশের দলে ছিলেন না দুই প্রধান পেসার নাহিদ রানা ও শরিফুল ইসলাম। কিন্তু মাঠে নামার পর সব সমীকরণ বদলে দিল বাংলাদেশ। জয়ের জন্য মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ম্যাচ বের করে নিল হেসেখেলে। খেলার আগের সেই আগাম ধারণা চুরমার হয়ে গেছে বলেই ক্রিকেটীয় পরিভাষায় এটি একটি ‘আপসেট’।

মূলত, ‘আপসেট’ শব্দটি দিয়ে মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও বেশি বোঝানো হয় ম্যাচের আগের মানসিক অবস্থাকে। কোনো আন্ডারডগ দল শেষ বলে কষ্টার্জিত জয় পেলেও তা আপসেট, আবার ৯ উইকেটে উড়িয়ে দিলেও তা আপসেট।

বরং জয়ের ব্যবধান যত বড় হয়, অঘটনের মাত্রা নাকি তত বাড়ে! বিখ্যাত ক্রিকেট ওয়েবসাইট ক্রিকইনফো ২০২৫ সালে একটি ‘আপসেট ইনডেক্স’ আর্টিকেল ছাপায়—যেখানে দলের সামর্থ্য, সাম্প্রতিক ফর্ম ও জয়ের ব্যবধান হিসাব করা হয়। সেই হিসেবে, ৯ উইকেটের জয়টি কেবল অঘটন ছিল কি না তা প্রমাণ করে না, বরং অঘটনটি কতটা বিশাল ছিল তা বাতলে দেয়।

খেলার দুনিয়ায় এমন কিছু শব্দ থাকে যা সময়ের সাথে নিজস্ব অর্থ তৈরি করে নেয়। যেমন ক্রিকেটে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা দলকে বলা হয় ‘মিনোস’, অর্থহীন ম্যাচকে বলা হয় ‘ডেড রাবার’, আর ফেভারিটদের উল্টে দেওয়াকে ‘আপসেট’। ফুটবলে ঠিক এই জিনিসটাকেই বলা হয় ‘জায়ান্ট কিলিং’ বা ‘শক’। স্পোর্টস ডিকশনারিতে এসব শব্দ কারোর অনুভূতির তোয়াক্কা করে না, নির্ধারণ হয় ম্যাচের আগের শক্তিমত্তা আর র‍্যাঙ্কিং দিয়ে।

ইতিহাসের দিকে তাকালেও একই সত্য দেখা যায়। চলতি বছরের জুনে জিম্বাবুয়ের কাছে যখন একমাত্র টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ, তখনো সেটাকে সবাই ‘আপসেট’ বলেছিল। কারণ সাম্প্রতিক ফর্মে বাংলাদেশ এগিয়ে ছিল। কিন্তু এই শতাব্দির শুরুর দিকে হিথ স্ট্রিক আর অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারদের জিম্বাবুয়ে যদি বাংলাদেশকে হারাত, তবে তাকে নিশ্চয়ই কেউ ‘অঘটন’ বলত না।

সামনে ম্যাকাউতে সিরিজের শেষ টেস্ট। ডারউইনে হারলেও কাগজে-কলমে অস্ট্রেলিয়াই এগিয়ে থাকবে। সেখানেও অস্ট্রেলিয়ার হার কল্পনা করা কঠিন। তবে বাংলাদেশ যদি সেখানেও জয়টি পুনরাবৃত্তি করতে পারে, তবে এই ‘আপসেট’ শব্দের অর্থটাই হয়তো নতুন রূপ পাবে।

ডারউইনের জয়কে ‘আপসেট’ বলা মানে আসলে এটাই মনে করানো—বাংলাদেশ মাঠে নেমে ম্যাচটাকে যতটা সহজ বানিয়ে ছেড়েছে, কাগজের কলমে কাজটা মোটেও অত সহজ ছিল না।

সম্ভবত টাইগারদের আসল চ্যালেঞ্জটাও লুকিয়ে আছে এখানেই। দেশের মানুষের সঙ্গে ক্রিকেট দলের আবেগটা চিরকালের। এত সাফল্য সত্ত্বেও ক্রিকেটের বড় কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি এখনো অধরাই রয়ে গেছে বাংলাদেশের। তবে এমন একদিন নিশ্চয়ই আসবে, যখন বড় টুর্নামেন্ট জেতাটা আর রূপকথা মনে হবে না; অসিদের টেস্টে হারানো কোনো অঘটন নয়, বরং টাইগারদের ক্রিকেটীয় অগ্রগতির স্বাভাবিক অধ্যায় বলে গণ্য হবে।

সেদিন অন্তত এই জয়গুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে কাউকে অভিধান থেকে ‘আপসেট’ শব্দটি খুঁজতে হবে না। তবে ভবিষ্যতের সেই নতুন যুগের সূচনা বিন্দু হিসেবে ইতিহাস ডারউইনকেই মনে রাখবে।

 

Most Popular