ফজলুর রহমান বাবু এ পর্যন্ত ছয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। থিয়েটার দিয়ে শুরু করে টেলিভিশন নাটক, চলচ্চিত্র, ওটিটি, সব মাধ্যমেই সাবলীল অভিনয় করে আসছেন। গুণী এই শিল্পী কীভাবে অভিনয়ে এসেছিলেন? সেই গল্প তিনি জানিয়েছেন দ্য ডেইলি স্টারকে।
ফরিদপুরে নাটকের রিহার্সেল দেখতে গিয়েই প্রথম অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন বলে জানান এই অভিনেতা।
শুরুর গল্প বলতে গিয়ে ফজলুর রহমান বাবু বলেন, ‘অভিনয় শুরু করেছিলাম ফরিদপুরে, যেখানে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। একদিন নিজের শহরের সে সময়কার নাট্যকার মোহাম্মদ আলী রুমী ভাই জিজ্ঞেস করেন—অভিনয় করবে? কোনো কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে যাই। এভাবেই শুরু।’
তারপর? ফজলুর রহমান বাবু বলেন, ‘এরপর রুমী ভাই এক দিন আমাকে মহড়া দেখতে নিয়ে যান। তখন আমার বয়স ১৭ বছর। “তালেব মাস্টারের হালখাতা” নামের একটি নাটকের মহড়া দেখতে গিয়ে ভালো কিছু অভিজ্ঞতা হয় আমার। মহড়া দেখতে গিয়েই আমি অভিনয় করার সুযোগ পেয়ে যাই। এই দলের হয়ে ওই নাটকে জীবনের প্রথম অভিনয় করি।’
তিনি বলেন, ‘এই ঘটনা ১৯৭৮ সালের। অসাধারণ কিছু মুহূর্ত পেয়েছিলাম সেদিন। জীবনের প্রথম মঞ্চে অভিনয়, কাজেই ভালো লাগাটা ব্যাখ্যা করা কঠিন। সেই স্মৃতি আজও ভুলিনি। এই স্মৃতিটুকু সব সময়ই মনে পড়বে।’
প্রথম নাটকে নিজের চরিত্র নিয়ে তিনি বলেন, ‘“তালেব মাস্টারের হালখাতা” নাটকে ১৪ বছরের একজন কিশোরের চরিত্রে অভিনয় করতে দেওয়া হয়। তখন আমার বয়স ১৭ বছর হলেও দেখতে কিশোরের মতোই ছিলাম আমি। যার ফলে দর্শকরাও আমাকে খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছিল।’
পেছনের স্মৃতি হাতড়ে ফজলুর রহমান বাবু আরও বলেন, ‘সেই সময়ে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে জাতীয় নাট্যোৎসব হতো। প্রত্যেক জেলা থেকে একটি করে নাটকের দল নাটক করার সুযোগ পেত। শিল্পকলা একাডেমিতে মাসব্যাপী এই নাট্যোৎসব হতো। ফরিদপুর টাউন থিয়েটারের হয়ে আমরাও সেখানে সুযোগ পাই। এটি আমার জীবনে একটি বড় ঘটনা।’
পুরোনো দিনের গল্প বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘কিছুদিন পর রুমী ভাই ফরিদপুরে বৈশাখী নাট্যগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেন। আমিও ওই দলে যুক্ত হই। এরপর ১৯৮৩ সালে আমি ঢাকায় চলে আসি এবং আরণ্যক নাট্যদলে যুক্ত হই। নাট্যজন মামুনুর রশীদ আমার গুরু ও শিক্ষক। আরণ্যক নাট্যদলে যুক্ত হওয়ার পরই আমি সিদ্ধান্ত নিই যে আমি অভিনেতা হব।’
আরণ্যক নাট্যদলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফজলুর রহমান বাবু বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে, আরণ্যক নাট্যদলে যুক্ত হওয়ার পর নিজেকে তৈরি করার ও নিজেকে গড়ার সুযোগ তৈরি হলো এবং সেভাবেই নিজেকে গড়তে শুরু করি। এ জন্য আরণ্যক নাট্যদলের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।’
তিনি বলেন, ‘আরণ্যক নাট্যদলের হয়ে প্রথমে “সাত পুরুষের ঋণ” নাটকে অভিনয় করি। কেন্দ্রীয় চরিত্র বলতে যা বোঝায়, তা করি অনেক পরে, ১৯৯০ সালে। “পাথর”, “জয়জয়ন্তী”, “ময়ূর সিংহাসন”—এই তিনটি নাটকের কথা মনে পড়ছে। এই তিনটিতে ভালো ভালো চরিত্রে অভিনয় করি এবং দর্শকদের কাছ থেকে বেশ সাড়া পাই।’
প্রথম টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করার স্মৃতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘টেলিভিশনে প্রথম অভিনীত নাটকের নাম “মৃত্যুক্ষুধা”। কাজী নজরুল ইসলামের লেখা থেকে নাটকটি প্রযোজনা করেন কাজী আবু জাফর সিদ্দিকী। সেখানে আমি মহাজনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। কী যে খুশি হয়েছিলাম সেদিন! ওই নাটকের জন্য সম্মানীও পেয়েছিলাম।’
ক্যারিয়ারের শুরুতে ‘ইতিকথা’ নাটক দিয়ে বড় পরিচিতি পান তিনি। তিনি বলেন, ‘“ইতিকথা” নাটকে পরাণ মাঝির চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। সেই সময় নাটকটি খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এই নাটক দিয়েই দর্শকেরা আমাকে চিনতে শুরু করেন। অনেকেই তখন আমাকে পরাণ মাঝি বলে ডাকতেন, কেউ কেউ পরাণদাও বলতেন।’
প্যাকেজ নাটক আসার পর তিনটি ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেন ফজলুর রহমান বাবু, যা তার ক্যারিয়ারকে উজ্জ্বল করে। নাটক তিনটি হচ্ছে ‘শিল্পী’, ‘দানব’ ও ‘সুন্দরী’।
‘শিল্পী’ এ দেশের প্যাকেজ বা বেসরকারি ব্যবস্থাপনার আওতায় বিটিভিতে প্রচারিত প্রথম ধারাবাহিক নাটক, যার পরিচালক ছিলেন মামুনুর রশীদ। বাবু বলেন, ‘এই তিনটি নাটকেরই নাট্যকার ও পরিচালক ছিলেন মামুনুর রশীদ।’
ফজলুর রহমান বাবু বলেন, ‘তিনটি নাটকে তিন রকম চরিত্রে অভিনয় করে প্রচুর সাড়া পাই এবং এটি আমার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। এই তিনটি নাটকের জন্য আমার নাট্যগুরু মামুনুর রশীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’
ফজলুর রহমান বাবু বড় পর্দায় প্রথম অভিনয় করেন আবদুল্লাহ আল-মামুনের ‘বিহঙ্গ’ সিনেমায়। এরপর অভিনয় করেন আবু সাইয়ীদ পরিচালিত ‘শঙ্খনাদ’ সিনেমায়। এই ‘শঙ্খনাদ’ সিনেমা দিয়েই তিনি প্রথমবারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।
